
চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনী। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা অত্যাধুনিক এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স) ব্যবহার করে চীন অভিমুখে রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রদর্শন করেছে স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপাঞ্চলটি।
এটি প্রথমবারের মতো, যখন তাইওয়ান প্রণালির জলসীমায় হিমার্স থেকে রকেট নিক্ষেপ করে মহড়া পরিচালনা করা হলো। এর আগে দেশটি এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বিভিন্ন পরীক্ষা চালালেও চীন ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী কৌশলগত জলপথে এমন মহড়া হয়নি।
মহড়ায় অংশ নেওয়া তাইওয়ানের সেনা সার্জেন্ট ওয়াং মিং-হুই বলেন, বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে হিমার্স পরিচালনায় প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা হবে, যাতে দেশের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করা যায়।
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এ মহড়ায় দীর্ঘপাল্লার যুদ্ধাস্ত্রের পরিবর্তে স্বল্পপাল্লার প্রশিক্ষণমূলক রকেট ব্যবহার করা হয়েছে। এসব রকেট উপকূল থেকে সীমিত দূরত্ব অতিক্রম করে তাইওয়ান প্রণালির জলসীমায় গিয়ে পড়ে।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত তাইওয়ানের প্রতিনিধি আলেক্সান্ডার ইউই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, নতুন হিমার্স সিস্টেমের মাধ্যমে মূলত যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির অনুশীলন করছে তাইওয়ানের সেনাবাহিনী।
তিনি রসিকতার সুরে বলেন, আমরা একটি দ্বীপ। আমরা কেবল পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে গুলি ছুড়তে পারি। তাই সেনাবাহিনী পশ্চিম দিকটিকেই বেছে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, তাইওয়ানের পশ্চিমেই অবস্থিত চীনের মূল ভূখণ্ড।
হিমার্স হলো একটি অত্যাধুনিক, উচ্চ গতিশীল রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থা। ছয় চাকার সামরিক ট্রাকে স্থাপিত এই ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ কৌশলের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
এই কৌশলে মোবাইল লঞ্চারগুলো গোপন ঘাঁটি বা সুড়ঙ্গ থেকে দ্রুত বের হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং শত্রুপক্ষের রাডারে ধরা পড়ার আগেই নিরাপদ স্থানে সরে যায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এর টিকে থাকার সক্ষমতা অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বিশাল সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে তাইওয়ানকে অসমমিত বা ‘অ্যাসিমেট্রিক’ যুদ্ধকৌশলে দক্ষ করে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
সামরিক পরিভাষায় এই নীতিকে ‘পোরকুপাইন স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘সজারু কৌশল’ বলা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য আক্রমণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাইওয়ানের পশ্চিম উপকূলে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী সামরিক মহড়ার দ্বিতীয় দিনে হিমার্স ছিল প্রধান আকর্ষণ। পাশাপাশি ১৫৫ মিলিমিটার হাউইটজার কামানও মহড়ার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার অঙ্গীকার করেছে।
এর অংশ হিসেবে বেইজিং প্রায় প্রতিদিনই তাইওয়ানের আকাশ ও জলসীমার কাছাকাছি যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমান স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এবং তাইওয়ানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তাইওয়ানের কাছে আরও ৮২টি হিমার্স সিস্টেম বিক্রির একটি বড় চুক্তির ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। তবে সম্প্রতি বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ওই অস্ত্র চুক্তির বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন