
বিশ্বের মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। কোম্পানিটি প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) মাধ্যমে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
এই বিশাল সাফল্যের ফলে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছে গেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্পেসএক্স প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার দরে মোট ৫৫ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার বাজারে ছেড়েছে। এর ফলে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কোনো আইপিও-পরবর্তী মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড।
এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, কোম্পানিটি প্রতি শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
স্পেসএক্সের এই আইপিও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি জায়ান্ট সৌদি আরামকোর আগের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকো আইপিওর মাধ্যমে ২৫.৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিল, যা এতদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইপিও হিসেবে বিবেচিত ছিল।
নাসডাকে লেনদেন শুরু হলে স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম বৃহত্তম তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হবে। কোম্পানিটির মূল্যায়ন ইতোমধ্যে জেপিমরগ্যান চেজ, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে, এলি লিলি অ্যান্ড কোম্পানি, মেটা প্ল্যাটফর্মস এবং টেসলার মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আইপিও সফল হলেও প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্সের ওপর।
নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ৫০ পার্ক ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী অ্যাডাম সারহান বলেন, প্রথম দিনের লেনদেনের চেয়ে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটিকে কীভাবে গ্রহণ করেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, স্পেসএক্সের বর্তমান মূল্যায়ন অত্যন্ত উচ্চ। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এখনও ধারাবাহিকভাবে বিপুল মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া কোম্পানির আয়ের বড় অংশ আসে তাদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিঙ্ক থেকে।
স্পেসএক্স জানিয়েছে, তারা সম্প্রতি গুগল ক্লাউডের সঙ্গে বহু বছরের ক্লাউড সেবা চুক্তি করেছে। এই অংশীদারত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা প্রসেসিং এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্পেসএক্সের মূল লক্ষ্য মানবজাতিকে বহু গ্রহে বসবাসের উপযোগী করে তোলা। কোম্পানির দাবি, তাদের সম্ভাব্য বাজারের আকার ২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা ভবিষ্যতে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বাজারে পরিণত হতে পারে।
বর্তমানে স্টারলিংক বিশ্বের ১৬৪টি দেশ ও অঞ্চলে কোটি কোটি গ্রাহককে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। এছাড়া গত তিন বছরে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো উপগ্রহ, মহাকাশযান ও অন্যান্য সরঞ্জামের ৮০ শতাংশেরও বেশি স্পেসএক্সের রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বলে কোম্পানির দাবি।
তবে বিশাল মূল্যায়নের পাশাপাশি কিছু বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোম্পানিটির আয়ের একটি বড় অংশ এখনও সরকারি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিন মহাকাশ বাণিজ্য এবং সরকারি প্রকল্পের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
এছাড়া আইপিওর পরও ইলন মাস্কের হাতে কোম্পানির প্রায় ৮২ শতাংশ ভোটাধিকার থাকবে। ফলে স্পেসএক্সের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার নিয়ন্ত্রণ প্রায় একচ্ছত্র থাকবে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের ধারণা, বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেলে সেটি মূলত বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের প্রতিফলন হবে বলে মনে করছেন তারা।
এই ঐতিহাসিক আইপিও পরিচালনায় যৌথ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছে গোল্ডম্যান স্যাক্স, মরগান স্ট্যানলি, ব্যাংক অফ আমেরিকা, সিটিগ্রুপ এবং জেপি মরগান চেজ।
মন্তব্য করুন