
বছর তিন আগে লিখেছিলাম মাদকের ভয়াল প্রভাবে এক কৃষকের স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী। বর্গাচাষি এক কৃষক পরের জমিতে চাষ করে আর স্বপ্ন দেখে তার তিন ছেলে লেখাপড়া শিখবে, চাকরি করবে। ছেলেরা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই স্বপ্ন তাকে আরও পরিশ্রমী হতে সাহস জোগায়। ছেলেদের লেখাপড়ায় যেন বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখে। কষ্টে উপার্জিত অর্থের সবটুকুই ব্যয় করে ছেলেদের চাহিদা মেটাতে। কিন্তু বিধি বাম দিকে ঘুরিয়ে দেয় তার সব চেষ্টা। মাদকের ভয়ানক আখড়ায় জড়িয়ে পড়ে তার ছেলেরা।
অসৎসঙ্গে মিশে আর নেশার খপ্পরে পড়ে লেখাপড়ার সকল চেষ্টা বিফলে যায়-- একপর্যায়ে লেখাপড়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে সুস্থ জীবনে সৎকর্ম করে বেঁচে থাকুক এই আশায় ছেলেদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়। বাবার স্বপ্ন আর পূরণ হয় না।
মাঝে কেটে গেছে কয়েক বছর। মাদকের সাথে জড়িত সাঙ্গপাঙ্গরা থামে থাকেনি বরং তাদের দৌরাত্ম আরও বেড়েছে। সেই সাথে কৃষকের উপর তাদের পুরনো ক্ষোভ রয়েই গেছে। বিভিন্নভাবে তাকে হেনস্তার শিকার হতে হয়। অপরাধ একটাই, মাদক সেবনে বাধা দেওয়া। ছেলেদের ওদের সাথে মিশতে না দেওয়া।
কথাগুলো আবার লিখলাম এই কারণে- এ শুধু একজন কৃষকের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নয় অসংখ্য পরিবার আজ মাদকের ভয়াবহ সংক্রমণে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। শুধু কৃষক শ্রমিক নয় সমাজের উচ্চতর থেকে নিম্নস্তরের সর্বত্র এই বিপর্যয় দানা বেঁধেছে। অদৃশ্য এই দানবের আক্রমণ আমাদের চোখে পড়ে না কিন্তু ভিতরে ভিতরে নিঃস্ব হয়ে যায় একেকটা পরিবার। প্রথমত এই মাদকের শিকার স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এই মারণনেশা জীবনের শুরুতেই তাদের স্বপ্ন কেড়ে নেয়। তারা ভুলে যায় স্বপ্ন দেখতে, ভুলতে শুরু করে জীবনের লক্ষ্য। ধীরে ধীরে ভুলতে থাকে বাবা-মায়ের অনুভূতি, সামাজিক পরিচিতি। সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের উৎকণ্ঠা, স্নেহ- মমতা কোনোকিছুই আর বোধের মধ্যে থাকে না।
অধিকাংশ পরিবারে ইদানিং একটি দুটি সন্তান। বাবা-মা সাধ্য অনুযায়ী স্বপ্ন দেখে তাদের সন্তান বড়ো হবে, ভালো মানুষ হবে। সকল বাবা-মা, সে যেমন হোক, সমাজের যে স্তরে বাস করুক সন্তানকে নিয়ে এই স্বপ্ন সকলের জন্য এক। অথচ সামাজিক ভাবে আমরা সবাই বিষয়টি নিয়ে নির্বিকার। নীরব ঘাতকের মতো গ্রাম, শহর, মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের ভয়াবহতা, ঠিক যেন সংক্রামক ব্যাধির মতো কিন্তু প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রথম দিকে বাবা-মা বিশ্বাস করতে চায় না তার ছেলে নেশা করে, তারপর যখন বিপদ সামনে এসে দাঁড়ায় তখন জানাজানি হলে মান-সম্মান চলে যাবে ভয়ে লুকিয়ে সমাধানের চেষ্টা করে। ছেলেকে মারধর বা নানারকম শাসন করে। ফলে হিতে বিপরীত হয়, ছেলে আরও বিগড়ে যায়। অনেক সময় মা ছেলের বাবাকেও আড়াল করে কারণ হয়তো বাবা শুনলে মারধর করবে। কারও সঙ্গে পরামর্শ করতেও অস্বস্তি বোধ করে। এভাবেই পরিস্থিতি একসময় হাতের নাগাল পেরিয়ে যায়।
নেশার ছোবল একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়। নেশার দ্রব্য কিনতে টাকা লাগে। শিশু বয়সে নেশার দ্রব্য কিনতে মায়ের থেকে টাকা নেয়া শুরু হয়। তারপর চাহিদার যোগান দিতে না পারলে মায়ের উপর অত্যাচার, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে টাকা আদায় করে। একপর্যায়ে নিজের ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি, বলা যায় প্রথমে নিজের ঘরে চুরি তারপর একসময় অন্যের ঘর পর্যন্ত চুরির হাত পৌঁছে যায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত সমাজে এই ধরণের সমস্যা পরিবারের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকলেও নিম্নবিত্ত সমাজে, গ্রাম থেকে শহর, নগর বস্তিতে এর প্রভাব শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। চুরি -ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি এসব অনেক কিছুরই মূল উৎপত্তি এই নেশার দ্রব্য গ্রহণ থেকে। নেশার কারণে এদের বোধবুদ্ধি, ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান লোপ পায়।
এই ভয়াবহতা মরণব্যাধির থেকেও মারাত্মক। এ বিষয়ে বলতে গেলে একটি কথার সুত্রে অনেক কথা চলে আসে। আমাদের দেশে এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ হয়। মেয়েরা অল্প বয়সে মা হয়। শারীরিক, মানসিক ভাবে মায়ের দায়িত্ব বোঝার মতো বুদ্ধিমত্তা তখনও তৈরি হয় না। সে ব্যাপারে আমরা ভ্রুক্ষেপহীন। চিন্তাই করি না যে মা হওয়া মানে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার আনন্দ না, একজন মানুষকে পৃথিবীতে আনা এবং তাকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই দায়িত্ব কোনো সহজ ব্যাপার নয়। মায়ের শরীর ও মনের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাবা-মা দুজনের সমান দায়িত্বশীলতাই পারে সার্বিক সুস্থ মানুষ তৈরি করতে। এটাই সার কথা।
ব্যতিক্রম হয়তো আছে কিন্তু তা উদাহরণ নয়। আমাদের সমাজে সাধারণত বাবারা সন্তানের দায়িত্ব মায়ের একার মনে করে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যান। সন্তান ভালো কিছু করলে আমার সন্তান বলে গর্বিত হন। ভুল পথে গেলে মায়ের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় মা সন্তানের বিপথগামীতা লক্ষ্য করলেও বাবার সাথে পরামর্শ করতে সাহস পায় না। অন্য কাউকে বলতেও তার আত্মমর্যাদায় বাধা পায়। ফলে ক্ষতি যা হবার তা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আমরা যত কিছুই করি আমাদের সন্তান যদি মানুষ না হয়, তারা যদি সুস্থ মন ও শরীরের অধিকারী না হয় আগামীর সমাজব্যবস্থা সুস্থ কাঠামো নিয়ে দাঁড়াবে না। যত উন্নতি, উন্নয়ন যা-ই হোক না কেন শিক্ষিত, শারীরিক, মানসিক ভাবে সুস্থ মানুষই দেশের প্রধান সম্পদ।
মন্তব্য করুন