
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের রাজনীতিতে প্রায় পাঁচ দশক ধরে পরিচিত মুখ গাজী নজরুল ইসলাম। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসা—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে তাঁর।
জনগণের ভোটে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ সাম্প্রতিক এক বিতর্কের জেরে রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়েও শুরু হয়েছে আইনি আলোচনা।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন গাজী নজরুল ইসলাম ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৬৩ সালে গাবুরা জিএনএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর সাতক্ষীরা কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে খুলনা বিএল কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ১৯৭৫ সালে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে মাকসুদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি থেকে মুক্তিযুদ্ধ গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়। সে সময় তিনি জাসদ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৭১ সালে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। তৎকালীন ৯ নম্বর সেক্টরে মেকানিক্যাল মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আলোচনার সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁকে তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাসদে যোগ দেন গাজী নজরুল ইসলাম। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় প্রথমবারের মতো মামলায় জড়িয়ে প্রায় তিন মাস কারাভোগ করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান ও সাংগঠনিক উত্থান ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সমর্থক হিসেবে সংগঠনটির রাজনীতিতে যুক্ত হন গাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে তিনি রোকন এবং শ্যামনগর থানা আমিরের দায়িত্ব পান।
তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন তিনি। ১৯৯৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত সংসদীয় রাজনীতিতেও গাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বার জয়লাভ করেন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হন তিনি। নির্বাচনে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামানকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম।
বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে গাজী নজরুল ইসলামকে। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রায় এক বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। এছাড়া ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৮ সালেও বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হন।
২০১৮ সালের শেষ দিকে একটি মামলায় তাঁর স্ত্রী মাকসুদা খাতুন ও মেয়ে শারমিন ফেরদৌসীকেও প্রায় ২৯ দিন কারাভোগ করতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিতর্কিত ভিডিও ঘিরে নতুন সংকট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। গত ২০ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
পরে এক বার্তায় গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই শ্যামনগরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জামায়াত থেকে স্থায়ী বহিষ্কার বিতর্কের মধ্যে ২২ জুলাই বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভায় নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শিক ও নৈতিক সংগঠন। গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলের মর্যাদা ও অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা আহ্বায়ক সোলায়মান কবির এ অভিযোগ করেন।
তাঁর দাবি, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলীয় এলাকার মেয়াদোত্তীর্ণ বালুমহালে গাজী নজরুল ইসলামের ছেলে, ঘনিষ্ঠ অনুসারী ও শিবিরের নেতাকর্মীদের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি একাধিকবার উত্থাপন করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমপি পদ নিয়ে আইনি আলোচনা দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয় থেকে লিখিত নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে বিতর্ক ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া রাজনৈতিক পথচলায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, দীর্ঘ শিক্ষকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে গাজী নজরুল ইসলামের জীবনে।
তবে সাম্প্রতিক বিতর্ক, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্য পদ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নতুন এক সংকট তৈরি করেছে। ফলে প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় এখন নানা বিতর্ক ও প্রশ্নের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।
মন্তব্য করুন