
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোংলা-রামপাল আসনে দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেও শেষ মুহূর্তে জোটগত সিদ্ধান্তের কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মো. রহমতুল্লাহকে। সেই ঘটনার পর এবার মোংলা পৌরসভা নির্বাচনে তাকে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দলটির নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপটে রহমতুল্লাহর প্রার্থিতাকে এনসিপির জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয় ভোটারদের একাংশের মধ্যে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকেই জানতে চাইছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে মোংলায় জনকল্যাণমূলক কোনো কর্মকাণ্ডে রহমতুল্লাহর দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল কি না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রহমতুল্লাহ স্বীকার করেন, ৫ আগস্টের আগের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা খুব বেশি ছিল না। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন জনহিতকর কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন বলে দাবি করেন। যদিও এসব কর্মকাণ্ডের নির্দিষ্ট কোনো উদাহরণ তিনি তুলে ধরতে পারেননি।
রহমতুল্লাহ বলেন, “অতীতের হিসাব যাই হোক, মোংলার মানুষের পাশে থেকে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় আমার রয়েছে। পরিবর্তনের এই নতুন যাত্রায় আমি মানুষের সেবা করতে চাই।”
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও শেষ মুহূর্তে জোটগত সমঝোতার কারণে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন কি না।
এমন প্রশ্নের জবাবে রহমতুল্লাহ বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের সময় জোটের স্বার্থে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সমর্থন যাচাই এবং মোংলার মানুষের সেবার লক্ষ্যেই আমি মেয়র পদে নির্বাচন করছি। সরে দাঁড়ানোর কোনো প্রশ্নই নেই।”
তার এ অবস্থানের পরও ভোটারদের মধ্যে সংশয় পুরোপুরি কাটেনি।
মোংলার ব্যবসায়ী মো. কামাল হোসেন বলেন, “গতবার শেষ মুহূর্তে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় আমরা হতাশ হয়েছিলাম। এবারও প্রার্থী হয়েছেন, তবে অনেকেই মনে করছেন শেষ পর্যন্ত হয়তো আবারও জোটের সমীকরণে সরে দাঁড়াতে পারেন।”
তরুণ ভোটার শরিফুল ইসলাম বলেন, “রহমতুল্লাহ ভাইয়ের প্রার্থী হওয়া ইতিবাচক। নতুন দল হিসেবে এনসিপির জন্য এটি বড় সুযোগ। তবে আগের অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ এখনও তাকে নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ করছে।”
বুধবার (২২ জুলাই) রাতে মোংলা পৌর শহরের শফিউল্লাহ সড়কে এনসিপির আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে রহমতুল্লাহকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “দেশে এখনও হাসিনা আমলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রয়েছে এবং বর্তমান সরকার সেই পুরোনো কাঠামো ধরে রেখেছে। এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই আমাদের রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, “ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আইনের মুখোমুখি করাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোংলার রাজনীতিতে জোটগত সমীকরণ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদের সঙ্গে সমঝোতার কারণে রহমতুল্লাহকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল।
এবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে মোংলায় জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান এবং মেয়র পদে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেনের সম্ভাব্য প্রার্থিতা স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে রহমতুল্লাহ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে কতটা দৃঢ় থাকেন, সেটিই এখন মোংলার রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
মন্তব্য করুন