
আশির দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল অভিনেত্রী ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরী। তার নামেই সিনেমার টিকিট কিনতে দর্শকদের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে দেখা যেত। বিপরীতে নায়ক কে—তা জানারও প্রয়োজন মনে করতেন না অনেক দর্শক। অভিনয়, সৌন্দর্য ও জনপ্রিয়তায় সে সময়ের চলচ্চিত্রে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন এই অভিনেত্রী।
তবে রুপালি পর্দায় মহুয়ার সাফল্যের গল্প যতটা উজ্জ্বল, ব্যক্তিজীবন ছিল ততটাই বেদনাদায়ক। লোকলজ্জার ভয়ে জন্মদাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, পালক পিতার অবহেলা, অল্প বয়সে স্টুডিওপাড়ায় ঠেলে দেওয়া, জোরপূর্বক বিয়ে এবং দাম্পত্য জীবনের নানা সংকট—সব মিলিয়ে তার জীবন হয়ে উঠেছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। মাত্র ২৭ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে যায় তার জীবনের গল্প।
মৃত্যুর ৪১ বছর পর আবারও বড়পর্দায় ফিরছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী। মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবন ও রহস্যময় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত হচ্ছে সিনেমা ‘গুনগুন করে মহুয়া’। ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করছেন অঙ্কিতা মল্লিক। সিনেমাটি পরিচালনা করছেন রাজদীপ ঘোষ এবং প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছেন রানা সরকার।
মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যুদিন উপলক্ষে বুধবার (২২ জুলাই) সিনেমাটির পোস্টার প্রকাশ্যে আনেন প্রযোজক রানা সরকার।
'গুনগুন করে মহুয়া' নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি বই অবলম্বনে। এর একটি মালবিকা দাশগুপ্তের 'আগুনে ঢেকেছি মুখ'। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে মহুয়াকে নিয়ে কথা বলেছেন মালবিকা। লেখকের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে মহুয়ার জীবনের নানা দিক।
লোকলজ্জার ভয়ে মহুয়াকে ত্যাগ করেন জন্মদাতা। পালক পিতাও দেননি পিতৃস্নেহ। চার বছর বয়সে ঠেলে পাঠান স্টুডিয়োপাড়ায়। একসময় মহুয়াকে বিক্রি করে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেন। নিজেকে বাঁচাতে অসহায় মহুয়া বিয়ে করে বসেন। স্বামীও দেননি আশ্রয়ের ছায়া। উল্টো অভিনেত্রীর পালকপিতার সঙ্গে মিলে মহুয়াকে দিয়ে নীল ছবিতে অভিনয় করানোর চেষ্টা করেন।
পাড়া-পড়শীদের চোখেও ভালো হতে পারেননি মহুয়া। তবে স্টুডিওপাড়ায় দরদী বলে পরিচিত ছিলেন। শুটিংয়ের আগে এলাকার সব কুকুরদের নিজের হাতে খাওয়াতেন। কেউ বিপদে পড়লে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কিন্তু মানুষের জন্য এত কিছু করেও নিজের জীবনে যেন সুখের দেখা পাননি এই অভিনেত্রী। শেষ পর্যন্ত আগুনে ঝলসে তার মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজও রহস্যাবৃত।
মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও জল্পনা রয়েছে। লেখক মালবিকা দাশগুপ্ত মনে করেন, তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে আত্মহত্যার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে লেখক বলেন, মহুয়া আত্মহত্যা করলেও তিনি অবাক হবেন না। কারণ, তার একমাত্র সন্তান গোলা ছিলেন অভিনেত্রীর অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু সেই সন্তানকেও মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবন, সংগ্রাম, সাফল্য এবং রহস্যময় মৃত্যুর গল্প নিয়েই নির্মিত হচ্ছে ‘গুনগুন করে মহুয়া’। সিনেমাটি মুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সামনে বাংলা চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর জীবনের অজানা অধ্যায়গুলো নতুন করে উঠে আসবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
মন্তব্য করুন