
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি নির্দেশনা না মেনে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের অবাধ বিচরণের অভিযোগ উঠেছে। এতে হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সপ্তাহে দুই দিন—সোমবার ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে অতচ কালীগঞ্জ হাসপাতালে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চিকিৎসকদের কক্ষে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। এছাড়া সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চিকিৎসকদের সঙ্গে বিক্রয় প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের একটি অঘোষিত নিয়ম চালু রয়েছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সোসাইটি অব বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভস অ্যাসোসিয়েশন (ফারিয়া)-এর কিছু নেতার যোগসাজশে এই অনিয়ম বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার জাননো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভুক্তভোগী রোগী নাহার বেগম বলেন, “আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি, কিন্তু ডাক্তার সাহেব আমাদের না দেখে ওষুধ কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত থাকেন। এতে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কয়ার কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও তাদের সংগঠন চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং তারা সেই অনুযায়ী সাক্ষাৎ করছেন। তিনি দাবি করেন, প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভস অ্যাসোসিয়েশন (ফারিয়া) কালীগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ফরাদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, তাদের সংগঠন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের নির্দেশনা দিয়েছে। তবে প্রতিদিন সন্ধ্যা ও রাতে সাক্ষাৎ কীভাবে হচ্ছে—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায় নিজেদের ব্র্যান্ডকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে দেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানিই অনৈতিকভাবে ওষুধের প্রচার চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে; তারা চিকিৎসকদের বিনামূল্যে নমুনা ও উপহারের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের ওষুধ প্রেসক্রাইব বা সুপারিশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ওষুধের এমন অনৈতিক প্রচার রোধে ‘ড্রাগস (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ যা বাংলাদেশে ওষুধের উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করে তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি।
দেশে ওষুধের উৎপাদন, আমদানি ও গুণমান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ও এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিক্রয় বৃদ্ধি ও অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধের প্রচার চালায়, যদিও এই প্রক্রিয়াটি স্পষ্টতই অনৈতিক। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করলেও সব কোম্পানি সমান মানের পণ্য তৈরি করতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের মধ্যে বিতরণের জন্য তাদের বার্ষিক বাজেটে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখে। দেশি ও বহুজাতিক উভয় ধরনের ওষুধ কোম্পানির বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট ওষুধের প্রচারের জন্য তারা প্রায়ই চিকিৎসকদের ঘুষ দিয়ে থাকেন। একটি ওষুধ কোম্পানির সাবেক মেডিকেল প্রতিনিধি জানান, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উপলক্ষে চিকিৎসকদের আকর্ষণীয় উপহারের প্রস্তাব দেয়।
তিনি বলেন, প্রচারণামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের কলম থেকে শুরু করে নগদ অর্থ পর্যন্ত নানা কিছু দিয়ে থাকে। এমনকি কখনও কখনও তারা চিকিৎসকদের চেম্বার সাজানোর দায়িত্ব নেয় কিংবা চিকিৎসকের স্ত্রীর জন্য শাড়িও উপহার দেয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, মেডিকেল প্রতিনিধি হিসেবে চাকরির সময় তিনি এক চিকিৎসককে ক্রিস্টালের ফুলদানি উপহার দিয়েছিলেন যাতে তিনি তাঁর কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। তাৎক্ষণিকভাবে ওই চিকিৎসক ওষুধের গুণমান যাচাই না করেই এক রোগীর জন্য সেই ট্যাবলেটটি লিখে দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক কোম্পানি গ্রামীণ এলাকায় জনপ্রিয় ও পরিচিত চিকিৎসকদের দিয়ে নিজেদের ওষুধের প্রচার করানোর জন্য মাসে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা দিয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি বলে জানা গেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.শিশির কুমার সানা বলেন, সরকারি হাসপাতালে সরকারি বিধি লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। রোগীদের সেবা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য এবং ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান বলেন, এ গুলো চরম অন্যায় সরকারি পরিপত্রের বাইরে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। কোনো চিকিৎসক নিয়ম বহির্ভূতভাবে এ ধরনের সাক্ষাৎ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন