
বাংলাদেশ রেলওয়ের যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ (ডাবল ট্র্যাকিং) প্রকল্পের সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) যাচাই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের পরই সরকার ডাবল লাইন স্থাপন সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই ডাবল লাইন স্থাপন সম্পন্ন হলে এটি বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যাত্রী পরিবহণ ও পণ্য আমদানি রফতানিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। পাশাপাশি বেনাপোলের সাথে আরও কয়েকটি রুটে নতুন নতুন ট্রেন চালু করে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে কানেকটিভিটি তৈরি হবে। রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের ফিজিবিলিটি স্টাডি টিম সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এই টিমটি রোববার ও সোমবার দু’দিনব্যাপি যশোর ও বেনাপোল রেলস্টেশনসহ রেললাইন ও সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে। যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার সাইদুজ্জামান জানান, যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ (ডাবল ট্র্যাকিং) প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে উচ্চ পর্যায়ের এই টিমটি রোববার বেনাপোল স্টেশনসহ রেলসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, স্থাপনা ও রেললাইন পরিদর্শন করে। সোমবার এই টিমের সদস্যরা যশোর রেলওয়ে জংশন, রেললাইন, অবকাঠামো ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবল ট্র্যাকিং বা ডাবল লাইনে রূপান্তর করা হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে এটি সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় একটি ট্রেনকে অপর একটি ট্রেনের জন্য স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় (যাকে রেলের ভাষায় ক্রসিং বলে)। লাইনটি ডাবল হলে কোনো ট্রেনকে ক্রসিংয়ের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না। ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে ট্রেনের যাতায়াত সময় আরও অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট কমে আসবে। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় বা লেট হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। সিঙ্গেল লাইনের কারণে এই রুটে চাইলেও বেশি ট্রেন চালানো যায় না, কারণ লাইনের ধারণক্ষমতা (লাইন ক্যাপাসিটি) শেষ। ডাবল লাইন হলে ঢাকা, খুলনা, উত্তরবঙ্গ বা চট্টগ্রাম থেকে বেনাপোলের উদ্দেশ্যে অনেক বেশি সংখ্যায় যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে ভারতগামী পাসপোর্টধারী যাত্রী ও সাধারণ মানুষের টিকিটের সংকট দূর হবে। এছাড়াও বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে প্রতিদিন প্রচুর পণ্যবাহী ট্রেন বাংলাদেশে আসে। ডাবল লাইন হলে পণ্যবাহী ট্রেনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে এবং দ্রুত ফিরে যেতে পারবে। এতে ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) কমবে। সড়কপথের তুলনায় রেলে পণ্য পরিবহন অনেক সাশ্রয়ী। ফলে আমদানি-রপ্তানি করা পণ্যের খরচ কমে আসবে, যার সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাবেন। এই রুটটি আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের (যেমন: ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক) একটি অন্যতম প্রধান অংশ। ডাবল লাইন সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং রেল যোগাযোগ আরও অনেক শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা-যশোর রুটের যে গতি এসেছে, যশোর-বেনাপোল ডাবল লাইন হলে সেই গতির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে। এটি যাতায়াতকে করবে দ্রুতগতির এবং দেশের অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ (ডাবল ট্র্যাকিং) করার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ‘কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রিপারেটরি ফ্যাসিলিটি’র অধীনে কাজ করছে। ২০২৪ সালে যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ (ডাবল ট্র্যাকিং) প্রকল্পের সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) যাচাই শুরু হয়। এই সম্ভাব্যতা যাচাই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী, খুব দ্রুতই এর মূল নির্মাণকাজের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের ফিজিবিলিটি স্টাডি টিম রোববার বেনাপোল স্টেশনসহ রেলসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, স্থাপনা ও রেললাইন পরিদর্শন করে। সোমবার এই টিমের সদস্যরা যশোর রেলওয়ে জংশন, রেললাইন, অবকাঠামো ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। এই টিমে রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (বিপণন ও কর্পোরেট পরিকল্পনা) বেনুরঞ্জন সরকারসহ তিন বিদেশি বিশেষজ্ঞ। সূত্র অনুযায়ী, যশোর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটারের এই রুটে ডাবল লাইনের জন্য নতুন ট্র্যাক বসাতে হলে বিদ্যমান লাইনের পাশে অতিরিক্ত ভূমির প্রয়োজন হবে। তবে এটি যেহেতু বর্তমান লাইনের পাশ দিয়েই যাবে, তাই রেলওয়ের নিজস্ব মালিকানাধীন যে জায়গা আছে, প্রথমে সেটি ব্যবহার করা হবে। নতুন করে খুব বেশি ফসলি জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না। তবে স্টেশন এলাকা এবং বাঁকগুলো (কারভেজ) সোজা করার জন্য কিছু জায়গায় নতুন করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এছাড়া যশোর-বেনাপোল লাইনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর বিদ্যমান পুরানো রেলসেতুটি। ডাবল লাইন করতে হলে বর্তমান সেতুর সমান্তরালে আরেকটি নতুন এবং আধুনিক ব্রডগেজ রেলসেতু নির্মাণ করতে হবে। সমীক্ষা দল এই সেতুর নকশা এবং নদের নাব্যতা বজায় রেখে কীভাবে পিলার স্থাপন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে। ঝিকরগাছা রেল স্টেশন এবং সংলগ্ন বাজার এলাকায় রেলওয়ের জায়গার ভেতরে ও আশেপাশে অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট এবং বসতবাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি ঝিকরগাছা পৌরসভা এলাকার ভেতরে যেখানে বাঁক সোজা করতে হবে বা স্টেশনের লুপ লাইন বড় করতে হবে, সেখানে কিছু বেসরকারি জায়গা অধিগ্রহণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। বাজার ও জনবসতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে কীভাবে ডাবল লাইনের নকশা চূড়ান্ত করা যায়, বর্তমানে পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞরা সেই নকশা যাচাই করছেন। রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাদের জমি বা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে, তাদের একটি সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন নীতিমালার আওতায় এনে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কাজের শুরুতে কোনো সামাজিক বা আইনি জটিলতা না তৈরি হয়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যশোর রেলওয়ে জংশন পরিদর্শনে আসা বাংলাদেশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হাবিবুর রহমান বলেন, যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ প্রকল্প রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়ন হলে বেনাপোল থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সেটি অবশ্যই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং বেনাপোল বন্দরের কার্যকারিতার উপর নির্ভর করবে। ডাবল লাইন করা হলে যাত্রীপ্রাপ্তি সাপেক্ষে বেনাপোল থেকে খুলনা-মোংলা পর্যন্ত সারাদিন কমিউটার ট্রেন যাতায়াত করবে। এরপর বেনাপোল থেকে ঢাকায় আন্তঃনগর ট্রেন চলাচলে সংখ্যা ও গতি বাড়বে। বেনাপোল থেকে রাজশাহী ও চিলাহাটি পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যপরিবহণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) যাচাই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তারা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে দাখিল করবেন। এরপর সরকার ডাবল লাইন নির্মাণে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মন্তব্য করুন
০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
০৬ জুলাই ২০২৬, ১০:০০ পিএম
০৬ জুলাই ২০২৬, ১০:০৩ পিএম
০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৯ এএম
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৩ এএম