
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রতীকী এই ভেন্যু রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করছে, যা ফুটবল ইতিহাসে একটি অনন্য মাইলফলক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় পপ তারকা শাকিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় শিল্পী অংশ নেন। তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেও উদ্বোধনের আগে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।
মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ম্যাচ শুরুর প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামকে ঘিরে নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই সমর্থকদের স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পরামর্শ দেয়।
মেক্সিকো সিটির নাগরিক নিরাপত্তা সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় ২০০ জন মুখোশধারী বিক্ষোভকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ঘটনাটি উদ্বোধনী দিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আলোচনায় নিয়ে আসে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বকাপ উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভের কারণে মেক্সিকো সিটির কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া শহরের একটি ফ্যান জোনে সৃষ্ট পরিস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার পরও অধিকাংশ দর্শক বড় ধরনের বিলম্ব ছাড়াই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ফলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেক্সিকো সরকারের সঙ্গে জাতীয় শিক্ষক ইউনিয়ন সিএনটিই-এর একটি অংশের বিরোধ নতুন মাত্রা পায়। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবমের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০০৭ সালের বিতর্কিত আইএসএসএসটিই আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।
শিক্ষক সংগঠনের অভিযোগ, আইনটি রাষ্ট্রনির্ভর পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তে ভিন্ন কাঠামো প্রবর্তন করেছে, যা শিক্ষকদের স্বার্থের পরিপন্থী। একই সঙ্গে তারা ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবিও উত্থাপন করেছে।
বর্তমানে সিএনটিই টানা ১০ দিনের ধর্মঘট পালন করছে। এর ফলে দেশজুড়ে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হতে পারছে না বলে জানা গেছে।
সরকারের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেও বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে বিক্ষোভকারীরা আজতেকা স্টেডিয়ামের প্রধান সড়ক অবরোধ করে। তাদের বহন করা ব্যানারে লেখা ছিল, “ফিফা, চলে যাও।”
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মেক্সিকো সরকার ৯ জুন ঘোষণা দেয় যে, উদ্বোধনী ম্যাচের দিন রাজধানীর সব স্কুল বন্ধ থাকবে, যাতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগে শেষ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হলেও সামাজিক অস্থিরতা, শিক্ষক আন্দোলন, পরিবহন সমস্যা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ মেক্সিকোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। তবুও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরের সূচনায় ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে আজতেকা স্টেডিয়াম ও মেক্সিকো সিটি।
মন্তব্য করুন