
বাংলাদেশে নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চার্জ ও ফি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই হার কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এর ফলে খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব বাজারমূল্যেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর বিভিন্ন সেবার ফি পুনর্নির্ধারণ করেছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে কার্গো জাহাজ, বাল্কহেড, মাছ ধরার নৌকা এবং অন্যান্য নৌযানের জন্য সংরক্ষণ ফি (কনজারভেন্সি চার্জ) প্রতি গ্রস টনে ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই খাতে ফি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫০ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, লঞ্চ মালিকদের প্রতি যাত্রীর বিপরীতে বার্ষিক সংরক্ষণ ফি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রতি আট ঘণ্টার জন্য পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী সব ধরনের নৌযানের বার্থিং এবং মুরিং চার্জও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৯ সালেও সরকার নৌপরিবহন খাতের বিভিন্ন ফি ও চার্জ বৃদ্ধি করেছিল।
বাংলাদেশ কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নাজমুল হোসেন হামদু বলেন, বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে জাহাজ মালিকদের ভাড়া বৃদ্ধি করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না।
তার মতে, প্রথমে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ জাহাজ পরিচালনাকারীদের ওপর পড়লেও শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্য পরিবহন খরচের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়বে। কারণ কার্গো জাহাজে কাঁচামালের পাশাপাশি গম, ডাল, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন করা হয়।
নাজমুল হোসেন হামদু জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্য মাদার ভেসেল থেকে খালাস করে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল, পাথর, গম, ডাল, লবণসহ নানা পণ্য পরিবহনে লাইটার জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আইনবিষয়ক সম্পাদক কাজী আবদুল করিম বলেন, অপারেটররা বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা সরাসরি গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবেন না। ফলে ব্যবসায়ীদের নিজেদেরও একটি অংশ বহন করতে হতে পারে, যা তাদের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ অয়েল ট্যাংকার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির এক সাবেক সদস্য জানান, চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন চালুর পর থেকেই তেলবাহী ট্যাংকার মালিকরা আয়ের চাপের মুখে রয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আগের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কম পেট্রোলিয়াম পরিবহন করা হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে বিভিন্ন ফি বৃদ্ধি তেল পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নৌপরিবহন খাতের নতুন ফি কাঠামো জাহাজ মালিক ও পরিবহন উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং নির্মাণসামগ্রীর পরিবহন খরচ বাড়িয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।
মন্তব্য করুন
২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম