
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে ছড়ালো চরম উত্তেজনা, নাটকিয়তা আর লাল কার্ডের বারুদ। টুর্নামেন্টের অন্যতম লড়াকু দল সুইজারল্যান্ডের কঠিন প্রতিরোধ ৩-১ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। গোল, পাল্টা গোল, ফাউলের মহড়া আর ভিএআর (VAR) রিভিউ রেফারিকে বারবার পকেট থেকে কার্ড বের করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডকে ১০ জনের দলে পরিণত করে ম্যাচ পকেটে পুরেছে আলবিসেলেস্তেরা। এই দুর্দান্ত জয়ের ফলে আগামী ১৫ জুলাই আটলান্টা স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালের মহাযুদ্ধে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
কানসাস সিটির মহাকাব্য: মিনিট টু মিনিট গোলের বিবরণ
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ম্যাচ জমিয়ে তোলে। ম্যাচের চার গোলের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১-০ (আর্জেন্টিনা - ৪১ মিনিট): প্রথমার্ধের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার ব্যাক-টু-ব্যাক কর্নারের চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় সুইস ডিফেন্স। ৪১তম মিনিটে অধিনায়ক লিওনেল মেসির জাদুকরী ও মাপা কর্নার থেকে কাছের পোস্টে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম ডেডলক ভাঙেন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার।
১-১ (সুইজারল্যান্ড - ৫৩ মিনিট): বিরতি থেকে ফিরে সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে সুইজারল্যান্ড। ৫৩তম মিনিটে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের সাময়িক অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সুইজারল্যান্ডকে সমতায় ফেরান তাদের মিডফিল্ডার রেমো ফ্রেউলার (Remo Freuler)। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তিনি এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন।
২-১ (আর্জেন্টিনা - ৬৯ মিনিট): সমতার ধাক্কা সামলে ৬৯তম মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনাকে লিড এনে দেন ‘দ্য স্পাইডার’ হুলিয়ান আলভারেজ। লিওনেল মেসির একটি জোরালো শট সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল কোনোমতে প্রতিহত করলেও বল ক্লিয়ার করতে পারেনি ডিফেন্স। ১৮ গজ দূর থেকে এক অপ্রতিরোধ্য ও দর্শনীয় শটে বল জালে জড়ান আলভারেজ।
৩-১ (আর্জেন্টিনা - ৮৯ মিনিট): ম্যাচের অন্তিম লগ্নে সুইজারল্যান্ড অল-আউট আক্রমণে উঠলে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। ৮৯তম মিনিটে নিকোলাস গঞ্জালেসের গতিময় শট কোবেল ঠেকিয়ে দিলেও রিবাউন্ড বলে আলতো ছোঁয়ায় সুইজারল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন বদলি স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট: নাটুকে লাল কার্ড ও ভিএআর (VAR) ধামাকা ম্যাচের অন্যতম বড় নাটকের দেখা মেলে দ্বিতীয়ার্ধে, যা সুইজারল্যান্ডকে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়। সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো আর্জেন্টিনার বক্সে ঢুকে ডাইভ দিলে রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউলের জন্য শাস্তি দিতে যান। কিন্তু আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের আপত্তিতে রেফারি ভিএআর (VAR) রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
ভিএআর মনিটরে দেখা যায়, পারেদেস ফাউল করেননি, বরং পেনাল্টি পাওয়ার আশায় ব্রিল এমবোলো মাঠে পড়ে যাওয়ার মারাত্মক ভান (অ্যাক্টিং) করেছিলেন। রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পারেদেসের শাস্তি বাতিল করে অভিনয়ের ভান করার জন্য এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখান। ম্যাচজুড়ে এটি ছিল তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, যার ফলে রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া সুইজারল্যান্ড এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব, ব্যর্থতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গ (কার্ডের মহড়া)
আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক কৃতিত্ব: মেসি, ম্যাক অ্যালিস্টার, আলভারেজ ও মার্তিনেজের চমৎকার রসায়ন আজ আর্জেন্টিনাকে বড় জয় এনে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৮ গজ দূর থেকে আলভারেজের গোলটি ছিল ম্যাচ উইনিং মোমেন্ট।
সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্স ও এমবোলোর ব্যর্থতা: সমতায় ফেরার পর ব্রিল এমবোলোর সেই অপেশাদার ডাইভ ও লাল কার্ড পাওয়া ছিল সুইজারল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী ঘটনা। এছাড়া কোবেল প্রথম শটগুলো ঠেকালেও রিবাউন্ড বল ক্লিয়ার করতে না পারা সুইস ডিফেন্ডারদের বড় ব্যর্থতা।
কার্ডের মহড়া: নকআউটের তীব্র উত্তেজনার কারণে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই আগ্রাসী মনোভাব দেখা গেছে। ম্যাচের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রেফারিকে দুই দলের একাধিক খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করতে হয়েছে।
মিশন আটলান্টা: সামনে এবার থ্রি লায়ন্সরা
কানসাস সিটির রুদ্ধশ্বাস অধ্যায় শেষ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রাজপথে। আগামী ১৫ জুলাই আটলান্টা স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালের মেগা ম্যাচে আলবিসেলেস্তেরা মুখোমুখি হবে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে আসা শক্তিশালী ইংল্যান্ডের। বিশ্বমঞ্চের ফাইনালের টিকিট কাটার এই ধ্রুপদী লড়াই দেখতে পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
মন্তব্য করুন