
আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কিছু অপশক্তি নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ তৈরির চেষ্টা চালালেও বাংলাদেশের মানুষের চিরায়ত মূল্যবোধ হলো সম্প্রীতি ও সহাবস্থান।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নজরুল বর্ষের স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচন করেন। একই সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলা ও নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলায় একযোগে নজরুল বর্ষ পালনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, প্রাণীদের প্রতিও সহিংসতা বন্ধে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ না করলেও তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। একইভাবে বাংলাদেশের মানুষও তাঁকে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় ধারণ করে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯১৪ সালে কৈশোরে নজরুল প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করার সম্ভাব্যতা সরকার খতিয়ে দেখছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে সরকারিভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী, প্রেম, বিরহ, তারুণ্য এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি হিসেবে অভিহিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘জাতীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। পরাধীনতা, জুলুম, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শাণিত অস্ত্র।’
তিনি বলেন, ‘বিপ্লব-বিদ্রোহ, রণ-সংগীত, ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুন বা ইসলামী মূল্যবোধের গান; কিংবা ভজন-কীর্তন ও শ্যামা সংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ-প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ এবং মাতৃভূমিকে ভালোবাসার প্রধান দিশারি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব আন্দোলন-সংগ্রামে কবির সৃষ্টিশীলতাই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মূল ভাষা হয়ে উঠেছিল। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু অতীত ইতিহাস নয়, আজকের প্রজন্মের জন্য এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির, জীবন ও কর্মের সঙ্গে, গণমানুষ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘‘নজরুল বর্ষ’’ শুরু হয়েছে।’
প্রতিটি রাষ্ট্র এবং সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘যারা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা আমাদের সাহিত্য- সংস্কৃতি-সামাজিক মূল্যবোধ, আমাদের সামাজিক দর্শন, আমাদের মনোজগতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স, আমাদের জীবনের সকল পর্যায়েই তার প্রভাব অপরিসীম।’
তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সীমাহীন ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব, আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে একদিকে যেমন জ্ঞানের দ্বার উম্মোচন করে দিয়েছে, অপরদিকে মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার পথও উন্মুক্ত। এমন জটিল বাস্তবতায় কাজী নজরুলের ইসলামের কবিতা আমাদের উদীয়মান প্রজন্মের সামনে আশা জাগানিয়া আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।’
‘এ কারণেই কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে আবদ্ধ না রেখে তার সাহিত্য কর্ম, তার জীবনবোধ পৌঁছে দিতে হবে মানুষের ঘরে। কবি নজরুলের জীবন ও কর্ম, তার চিন্তা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সারাদেশে নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির’ মাধ্যমে দেশের সব জেলা-উপজেলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিটি অনুষ্ঠান সফলভাবে পালন করার আহ্বান জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বর্ষের কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন সরকারপ্রধান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনেক সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন নজরুল গবেষক এবং নজরুল সংগীত শিল্পীও সেখানে রয়েছেন।
আজ থেকে শুরু হওয়া এই নজরুল বর্ষ উদযাপনে বছরজুড়ে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, প্রকাশনা কার্যক্রম, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন থাকবে। এ ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে কবির সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং তা আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুভাষিক অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন
০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
০২ জুলাই ২০২৬, ১২:১০ এএম
০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম