বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন

মানিক দত্ত
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১০:২৩ এএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
মানিক দত্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে, গানে ও শিল্পচর্চায় আমরা কেবল যে নন্দনতাত্ত্বিকতা পাই তা নয়, তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে দার্শনিক চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ সাহিত্যিক S.T. Colridge বলেছেন, “No man was ever yet a great poet without being at the same time a profound philosopher.” অর্থাৎ, “যিনি একজন বড় মাপের কবি, তিনি একই সাথে একজন প্রগাঢ় দার্শনিক না হয়ে পারেন না।” বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে উক্ত মন্তব্য প্রযোজ্য। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ে ‘লিবার্ট বক্তৃতা’ প্রদানে আমন্ত্রণ পান। বিশ্বের খ্যাতনামা দার্শনিকরা এই বক্তৃতা দিয়ে আসছেন। বক্তৃতার নাম ছিল ‘ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ’ এই বক্তৃতার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে বিশে^র অন্যতম একজন দার্শনিকের স্থান দেয়া হয়।

রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ ১০৩টি কবিতার সংকলন। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে মূলদর্শন নিজের অহংকার ত্যাগ ও হৃদয় নির্মল করে সহনশীলতা প্রদর্শন। বিশে^র বিশালতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে উৎসারিত এক আধ্যাত্মবোধের সঙ্গে এই বিশ^াস যুক্ত।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন মনুষত্বেরই অন্য নাম। হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তি ও সংস্কৃতির বিকাশই শিক্ষা। জ্ঞানের সাহায্যে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করা যায়। শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল রাজনৈতিক ও গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি বিশ^বিদ্যালয়। কারণ বাঙালীর সাহিত্যে, নাটকে, কবিতায়, চিত্রকলায়, সংগীতে, লোকসাহিত্যচর্চায়, ভাষাবিজ্ঞানে সর্বত্র তিনি ছিলেন। ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষা যে প্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক সেটা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।

স্বদেশি আন্দোলনকালে রচিত গানগুলি সাক্ষ্য দেয় দেশের পরাধীনতার গ্লানি কবিকে কতদূর ব্যাকুল ও বিচলিত করেছিল। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত তো তাঁর কবিতা থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মানতেন যে ‘music expresses where words are helpless.’ সংগীতের সেই শক্তির ওপর তাঁর আস্থা ছিল। স্বৈরাচারের দেশে সংস্কৃতির বিদ্রোহের চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শন সেই রাষ্ট্রকে তিনি মানেন নি, যে রাষ্ট্র স্বৈরাচারী। বিশেষভাবে সাক্ষী তাঁর নাটকগুলো; ‘তাসের দেশ’ ও ‘রক্তকরবী’, ‘অচলায়তন’ ও ‘মুক্তধারা’। ব্রিটিশ যুগে রাষ্ট্র ছিল স্বৈরাচারী। রবীন্দ্রনাথকে তাই রাষ্ট্র শক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে বহুবার। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মে তিনি যোগ দিয়েছেন, বক্তৃতা করেছেন রাজনীতির মঞ্চ থেকে। ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ শাসকেরা যে হত্যাকান্ড ঘটায় সেদিন তাঁর প্রতিবাদই ছিল সবচেয়ে জোরালো। ইংরেজ শাসকদের নিষ্ঠুরতাকে ধিক্কার জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ কেবল যে চিঠি লিখেছিলেন তা নয়, ইংরেজদের দেয়া নাইটহুড বা স্যার উপাধিও পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর লেখা ‘সভ্যতার সংকট’- এ ইংরেজ রাজত্বের অবসানের অবশ্যম্ভাবিতার বিশ্বাস ব্যক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করেছেন ও উত্তেজিত হয়েছেন সাম্রাজ্যবাদ আর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে। তাঁর মতে এ দু’দানব শুধু মানুষের সম্পদ হরণ ও শোষণই করে না, সাথে এর সাহিত্য ও সংস্কৃতিকেও বিনষ্ট করে। তাই দানবের বিরুদ্ধে কবি বলেন- “নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস/শান্তির ললিত বানী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস/ বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই/ দানবের সাথে সংগ্রামের তরে/ প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।” রবীন্দ্র দর্শনের মানবিক দিক নারীর প্রতি সমবেদনা ও নারী মুক্তি তাঁর বিভিন্ন গল্পে চিত্রিত হয়েছে। তিনি ছিলেন জীবন শিল্পী। ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) যৌতুক প্রথার জন্য বলিদান হওয়া একটি পরিবারের করুণ চিত্র এই ছোট গল্পটি। পণ প্রথার জন্য ‘অপরিচিতা’ গল্পের কল্যাণী সাহসী পদক্ষেপে নিজের বিয়ে নিজেই ভেঙে দেয়। কল্যাণীর সুচিশুভ্র আত্মপ্রকাশ যেন আগামীর নতুন নারীর আগামনী সঙ্গীত গেয়ে উঠেছে। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে বিমলাকে তিনি ঘরের বাইরে টেনে এনে তার কাছে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি দরজাগুলো একে একে উন্মুক্ত করে দিতে চেয়েছেন। ‘হৈমন্তী’ গল্পে বিবাহের পর হৈমন্তীর বয়স নিয়ে সমালোচনা করা, নাস্তিক ঘরের মেয়ে অপবাদ নিয়ে সংসারে অপমানের কন্টকশয়নে সে বসিয়া। রবীন্দ্রনাথের অঙ্কিত নারী পণপ্রথার বিরুদ্ধে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, পারিবারিক অন্যায়ের ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবি বলেছেন- ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (অব.)

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শেহবাজ শরিফ / অন্য দেশের মতো ইরানেরও ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকার আছে

নেতানিয়াহুকে ট্রাম্প / সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, কিন্তু আমি তোমার পাশে আছি

কিম জং-উন / জাপান ‘যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রে’ রূপ নিচ্ছে

পাগলাদহ থেকে মাদ্রাসাছাত্রী অপহরণ, থানায় লিখিত অভিযোগ

স্কটল্যান্ড ম্যাচে ফিরছেন নেইমার, ব্রাজিলের নতুন ছক ফাঁস!

পাবনায় প্রবাসীর স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

যশোরের বিশিষ্ট রোটারিয়ান ও সমাজসেবক ফজলে রাব্বী মোপাশা আর নেই

৩ ঘণ্টা বিমানে আটকা ব্রাজিল দল

রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল

মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে মাগুরায় যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল

সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন বদলি

আদালতের বারান্দায় মারামারি, বাদী-বিবাদীসহ ৪ জনের ৭ দিনের কারাদণ্ড

অভয়নগরে দুই দিনব্যাপী মতুয়া মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত

সুনামগঞ্জ মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত

সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর ব্রিজে স্থাপন করা হলো কালিমার পতাকা

নেহালপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলির প্রতিবাদে মানববন্ধন

মণিরামপুরে বিআরডিবির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত

মণিরামপুরে নিউ ব্রিকস ইটভাটা বন্ধের দাবিতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

বর্জ্যের দখলে কুমার নদ: জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়ছে ভয়াবহ ঝুঁকি

চেতনানাশক স্প্রে করে ব্যাংক কর্মকর্তার ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় যুবক আটক

X