
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান।
এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, বুধবার গভীর রাতে পরিচালিত এই অভিযান ছিল ইরানের “অব্যাহত ও অযৌক্তিক আগ্রাসনের” জবাব। হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা হলেও ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় কারগান শহরেও বিস্ফোরণে অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের দাবি, মার্কিন হামলায় দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে এবং একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র গত এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি একাধিকবার লঙ্ঘন করেছে। এর প্রতিবাদে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের নৌযান চলাচল স্থগিত থাকবে।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, তেলবাহী ট্যাংকার, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক পরিবহনও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।
আইআরজিসি দাবি করেছে, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম ও আহমাদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
এছাড়া তারা আরও দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের সামরিক স্থাপনা এবং জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত দুই দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
ইরানের দাবি, তারা একাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপ, সিরিক, জাস্ক এবং বন্দর আব্বাস বন্দরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং খাদ্য ও পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও নতুন করে সামরিক হামলা, পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মন্তব্য করুন
১০ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
১০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
১০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম