
বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং আকস্মিক অতিবৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া এই প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া এখন বৈশ্বিক জলবায়ুকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও উচ্চ জনঘনত্বের কারণে বাংলাদেশও এর বিরূপ প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর কারণে দেশের প্রচলিত ঋতুচক্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এর ফলে শুধু ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো পরিচিত রোগই নয়, ভবিষ্যতে নতুন ও অজানা ভাইরাসের বিস্তারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। এর ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদরোগজনিত জটিলতা এবং অন্যান্য প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে বন্যা ও দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পেতে পারে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মো. শামসুদ্দোহার মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়রিয়া ও ভেক্টর-বর্ন রোগগুলো এখন সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। এমনকি আগে নির্দিষ্ট বয়সসীমায় সীমাবদ্ধ থাকা কিছু রোগও এখন বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকর কৌশল তৈরি করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রোগজীবাণুর আচরণ ও বিস্তারের ধরন দ্রুত বদলে যাওয়া। চিকিৎসকদের মতে, আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া এবং বিভিন্ন ভাইরাল সংক্রমণকে আরও বেশি সংক্রামক ও মারাত্মক করে তুলতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাসের মতো নতুন কোনো সংক্রমণ ভবিষ্যতে আবারও দেখা দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তন নতুন ভাইরাসের জন্ম ও বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী রোটাভাইরাসের প্রকোপও ভবিষ্যতে বড় আকার ধারণ করতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, একটি নতুন রোগ কত দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলো নতুন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরেকটি মহামারির কারণ হতে পারে।
এ কারণে তাপপ্রবাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন
১০ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
১০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম