
দক্ষিণ ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলের কারণে অন্তত ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের মধ্যে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের স্পেন সীমান্তসংলগ্ন পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এক ডজনেরও বেশি ছোট শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান (প্রিফেক্ট) পিয়ের রেনো দ্য লা মোতের তথ্য অনুযায়ী, পারপিনিয়ঁ শহরের কাছে ত্রেভিয়াখ এলাকায় শুরু হওয়া দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আবারও অবনতি হয়েছে এবং নতুন করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার অভিযান শুরু হয়েছে। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন আরও দ্রুত বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
ত্রেভিয়াখ এলাকার বাসিন্দা পাত্রিস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আগুন তাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়বে, তা তারা কল্পনাও করেননি।
দাবানলের কারণে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর দে ফ্রান্স-এর তৃতীয় ধাপেও প্রভাব পড়েছে। জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে দর্শকদের রেসের শেষ ৪০ কিলোমিটার এলাকায় না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
প্রায় ১৯৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ধাপটি স্পেনের গ্রানোলার্স থেকে শুরু হয়ে ফ্রান্সের পিরেনি-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলের লে আঁগলসে শেষ হওয়ার কথা।
প্রতিযোগিতার পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান প্রুধোম বলেন, ব্যতিক্রমী দাবানল ট্যুরের জন্যও ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রাখে। আমরা দর্শকদের অনুরোধ করছি, রেসের শেষ অংশ ও ফিনিশিং এলাকায় না আসতে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাইপ্রাস ও সুইডেনে অবস্থানরত চারটি অগ্নিনির্বাপক বিমান ফ্রান্সে পাঠাচ্ছে।
দাবানলের প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী স্পেনেও। দেশটির লেস গাভারেস প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকায় ২ হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে।
কাতালোনিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত পর্যন্ত আগুনের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সপ্তাহের মধ্যেই পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে পূর্বাঞ্চলের কাস্তেয়োন প্রদেশে সিয়েরা দে এস্পাদান জাতীয় উদ্যানে দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় প্রায় ৫০০ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে তাপমাত্রা আবারও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ইতোমধ্যে পর্তুগাল ও স্পেনের কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে।
বিবিসি ওয়েদারের প্রধান আবহাওয়াবিদ ম্যাট টেইলর বলেন, জুন মাসের মতো নতুন রেকর্ড না গড়লেও বছরের এই সময়ের জন্য চলমান তাপপ্রবাহ অত্যন্ত অস্বাভাবিক। আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম থাকায় আরও দাবানলের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
গত জুনে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের সময় ফ্রান্সের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। ২৪ জুন দেশটি গড় হিসেবে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিন পার করে।
সেই তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে অতিরিক্ত ২ হাজার ২৫ জন, বেলজিয়ামে ১ হাজার ২২২ জন এবং নেদারল্যান্ডসে প্রায় ৪৮০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশে পরিণত হয়েছে। কোপার্নিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য বলছে, ইউরোপে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, পানির সংকট এবং ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মন্তব্য করুন
০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
০৬ জুলাই ২০২৬, ১০:০০ পিএম
০৬ জুলাই ২০২৬, ১০:০৩ পিএম
০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৩ এএম