
বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে। সেই মহাযজ্ঞের উদ্বোধনী মঞ্চে এবার ছিল বাংলাদেশেরও এক গর্বিত উপস্থিতি। মাঠের খেলায় না হলেও সাংস্কৃতিক মঞ্চে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে ও সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব।
শনিবার কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে কানাডা ও বসনিয়ার ম্যাচ শুরুর আগে অনুষ্ঠিত জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন তিনি। বিশ্ব তারকাদের ভিড়ে তিনি মঞ্চ ভাগ করে নেন বলিউড তারকানোরা ফাতেহি এবং আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট, অ্যালেসিয়া কারার মতো তারকাদের সঙ্গে।
ম্যাচ শুরুর প্রায় ৯০ মিনিট আগে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি ছিল বিশ্বকাপের এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধন। শুরুতে কানাডার আদিবাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবেশনা করেন আদিবাসী বংশোদ্ভূত শিল্পী উইলিয়াম প্রিন্স। এরপর সঞ্জয় দেব, নোরা ফাতেহী ও অন্যান্য শিল্পীদের প্রাণবন্ত পারফরম্যান্সে স্টেডিয়ামজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
পারফরম্যান্স চলাকালে সঞ্জয় দেবকে দেখা যায় বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায়। তার ডান হাতের স্লিভে এমব্রয়ডারির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক—রয়েল বেঙ্গল টাইগার, শাপলা ফুল এবং লাল-সবুজ পতাকা।
শুধু তাই নয়, পারফরম্যান্সের সময় বারবার নিজের স্লিভের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বকারী নকশাগুলো প্রদর্শন করতে দেখা যায় সঞ্জয়কে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাইরাল সঞ্জয়ের পারফরম্যান্সের সেই মুহূর্ত গুলো। সেখানে বাংলাদেশের এমন অভিনব উপস্থাপনাকে সবাই তাকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।
খায়ের খাজা নামে এক সোস্যাল এক্টিভিষ্ট সঞ্জয়ের ছবি পোষ্ট দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছে, নোরা ফাতেহির পাশের ছেলেটার নাম সঞ্জয় দেব। সে বাংলাদেশী এবং মৌলভীবাজারে জন্ম তার। বেড়ে উঠেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং একজন মিউজিক কম্পোজার তিনি। তার পোশাক ছিল সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যা দেখিয়ে বিশ্ব মঞ্চে জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করলেন তিনি।
সাহেল আহমেদ নামের এক প্রবাসী সাংবাদিক লিখেছেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে হাজারো আলো, কোটি কোটি দর্শক, অসংখ্য ক্যামেরার ভিড়ে বারবার ফিরে গেছেন তার শিকড়ের কাছে। তিনি শুধু গান শোনাতে আসেননি, তিনি যেন সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এক টুকরো বাংলাদেশ। স্যালুট সঞ্জয় ভাই।
সাইফ হাদি নামে এক দর্শক ফেসবুকে লিখেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে ভুলেননি সংগীত শিল্পী সঞ্চয়। সঞ্জয় প্রাউড অফ ইউ।
সোনিয়া আমীন নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী কমেন্টে লিখেছেন, চিন্তা করা যায়! হাজার মাইল দূরে বেড়ে ওঠা ছেলেটার কি অদ্ভুত টান দেশের জন্য। কি নাই, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, শাপলা, জাতীয় পতাকা।
মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক দর্শক লিখেছেন, মনে ইচ্ছা থাকলে এভাবেও বাংলাদেশকে তুলে ধরা যায় বিশ্বমঞ্চে। স্যালুট।
সঞ্জয় দেবের জন্ম বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন শৈশবের বড় একটি অংশ। এরপর পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এই শিল্পী বাংলা সংগীতের উপাদানকে ইলেকট্রনিক সাউন্ডের সঙ্গে মিশিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন।
সংগীতের লড়াইয়ে তিনি বৈশ্বিক। গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে বিচরণ থাকলেও নিজের শেকড়ের প্রতি তাঁর টান প্রবল। এমনকি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ২০২৫ এর থিম সং-এও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। বলিউডের শ্রেয়া ঘোষালের মতো শিল্পীর সঙ্গেও কাজ করেছেন সঞ্জয়।
সঞ্জয় দেবের প্রযোজনায় তৈরি গানগুলো ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে। তার কাজের মধ্যে “একলা দুনিয়া”, “ভুলে যাব” এবং “আড়ালে হারালে” উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনে আরও পরিচিত করেছে।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা সরাসরি না থাকলেও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বে সঞ্জয় দেব প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছা ও প্রতিভা থাকলে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা সম্ভব। তার এই উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এক বড় গর্বের মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন