
দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই আবারও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং আমদানি ও সরবরাহ ব্যয় বেড়েছে—এমন যুক্তি দেখিয়ে তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর আবেদন করেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমান দামে ভোজ্যতেল আমদানি ও বিক্রি করলে ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই দাম সমন্বয় না হলে আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গত ১১ জুলাই বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রথম দফায় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেয়। পরে বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া জানান, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং শিগগিরই আরও একটি বৈঠকের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ১ হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৮৮ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে খোলা পাম তেলের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৮৩ টাকা করার আবদার করেছে সংগঠনটি।
ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে মূলত ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত খরচ বেড়েছে। বর্তমান দামে বিক্রি করে তারা বড় অঙ্কের লোকসান গুনছেন।
ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারের দোহাই দিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্যে কিছুটা তারতম্য দেখা গেছে। বিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ১ হাজার ১৯১ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ১ হাজার ১৬৯ ডলার। অন্যদিকে পাম তেল প্রতি টন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৬২ ডলারে, যা মাসখানেক আগে ছিল ১ হাজার ১৪৫ ডলার।
বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা বাড়লেও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের সঙ্গে এর বড় ব্যবধান রয়েছে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তা ছাড়া, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্যে একগুচ্ছ করছাড় দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৯ এপ্রিলেও সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে বাজেটের করছাড় সমন্বয় করে তবেই দামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভোজ্যতেল একটি অতি সংবেদনশীল নিত্যপণ্য। এর দাম বাড়লে শুধু রান্নার খরচই বাড়ে না, বরং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ওপরেও এর চেইন রিঅ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাত দিলেও, যখন বিশ্ববাজারে দাম কমে তখন দেশের বাজারে ব্যবসায়ীরা সেই অনুপাতে দাম কমান না। তাই সরকারের উচিত হবে মিলমালিকদের এই ‘আবদার’ সরাসরি গ্রহণ না করে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে তেল বিক্রির পরিধি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের এই আকস্মিক দাবিতে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ভোক্তা অধিকার মহলে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন এই প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। দাম বাড়ানোর সময় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হলেও বিশ্ববাজারে দাম কমলে তাদের কোনো খবর থাকে না। সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে তারা ওত পেতে ছিল।
তিনি আরও হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, একদিকে বন্যার অজুহাতে সবজিসহ চালের বাজারে আগুন, তার ওপর নতুন করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জন্য তা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হবে। অস্থির সময়ে সরকারকে বিব্রত করতে এবং জনগণের পকেট কাটতেই গুটিকয়েক আমদানিকারক এই কারসাজি করছে। ব্যবসায়ীদের এই ফ্রিস্টাইলে দাম বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের হতে সরকারকে এখনই কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে, তা না হলে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন