
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের আকাশ তখন স্প্যানিশ লাল-হলুদ উল্লাসে মাতোয়ারা। বিশ্বমঞ্চের শেষ আটের মহাকাব্যিক লড়াইয়ে বেলজিয়ামের ‘রেড ডেভিলস’দের কঠিন প্রতিরোধ ২–১ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লুইস ডে লা ফুয়েন্তের স্পেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচে প্রথমার্ধের দাপট, দ্বিতীয়ার্ধে টুর্নামেন্টে স্পেনের প্রথম গোল হজম এবং শেষ মুহূর্তে ‘সুপার সাব’ মেরিনোর ক্ষিপ্রতা, সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক ক্ল্যাসিক নকআউট থ্রিলার। এই জয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী ১৪ জুলাই মঙ্গলবার ডালাসে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার মেগা টিকিট হাতে পেল লা রোখারা।
লস অ্যাঞ্জেলেসে নাটকের পর নাটক: যেভাবে এলো স্পেনের জয়
ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের চেনা ছন্দে আক্রমণাত্মক ‘টিকিটাকা’ ফুটবল উপহার দিতে থাকে স্পেন। দ্রুত বল আদান-প্রদান দিয়ে বেলজিয়ামের রক্ষণব্যূহ ভাঙার চেষ্টা চালায় তারা। ম্যাচের প্রথম ডেডলকটি ভাঙেন ফাবিয়ান রুইজ। ওয়ান্ডারকিড লামিন ইয়ামাল ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে বল বাড়িয়েছিলেন পেনাল্টি বক্সে। দানি ওলমো প্রথম স্পর্শেই জোরালো শট নিলেও থিবো কোর্তোয়া তা ঠেকিয়ে দেন। কিন্তু ফিরতি বলটি সরাসরি গিয়ে পড়ে ডি-বক্সে ওঁৎ পেতে থাকা ফাবিয়ান রুইজের পায়ে। নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে ১–০ গোলে এগিয়ে নেন তিনি।
তবে ১–০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বাঘের মতো গর্জে ওঠে বেলজিয়াম। পেনাল্টি এলাকার আশেপাশে দীর্ঘ সময় বল দখলে রেখে তারা স্পেনের ডিফেন্সকে চাপে ফেলে। স্প্যানিশ রক্ষণভাগ বল পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হলে সুযোগ বুঝে ডান প্রান্ত থেকে চার্লস ডি কেটেলারের উদ্দেশ্যে বল বাড়ানো হয়। এক জোরালো ‘ডাউনওয়ার্ড হেডার’-এর মাধ্যমে উনাই সিমনকে পরাস্ত করে বেলজিয়ামকে ১–১ সমতায় ফেরান ডি কেটেলারে। উল্লেখ্য, ২০২৬ বিশ্বকাপে এটিই ছিল স্পেনের হজম করা প্রথম গোল।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে ঝুঁকছিল, ঠিক তখনই স্পেনের জন্য ত্রাতা হয়ে আসেন বদলি খেলোয়াড় মাইক মেরিনো। পাউ কুবারসির একটি দূরপাল্লার শট বেলজিয়ামের গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্স ঠিকমতো গ্রিপ করতে পারেননি। হাত থেকে বল ফস্কে যাওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগটি চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় লুফে নেন মেরিনো। দারুণ এক রিবাউন্ড শটে বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে ২–১ ব্যবধানের জয় এনে দেন এই ‘সুপার সাব’।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার বিশ্লেষণ
মাইক মেরিনো ও স্পেনের আক্রমণভাগের কৃতিত্ব: বড় ম্যাচে একজন ‘সুপার সাব’ কীভাবে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন, মেরিনো তা আরও একবার দেখালেন। ইয়ামালের উইং প্লে, ওলমোর সুযোগ তৈরি এবং রুইজ ও মেরিনোর নিখুঁত ফিনিশিং স্পেনের আক্রমণভাগকে সফল করেছে।
বেলজিয়ামের গোলরক্ষকের মারাত্মক ভুল: পুরো ম্যাচে বেলজিয়াম দুর্দান্ত লড়াই করলেও অন্তিম মুহূর্তে গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্সের সেই শিশুতোষ ভুল পুরো দলের পরিশ্রমকে মাটি করে দিয়েছে। কুবারসির শটটি যেভাবে ল্যামেন্স হাতছাড়া করেছেন, তা নকআউটের মঞ্চে ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতা।
চার্লস ডি কেটেলারের লড়াই: ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও বেলজিয়ামের পক্ষে ডি কেটেলারের সেই অতিমানবীয় হেডার গোলটি ছিল মরুর বুকে এক চিলতে স্বস্তি, যা স্পেনের অপরাজিত রক্ষণের অহংকার ভেঙে দিয়েছিল।
মিশন ডালাস: সামনে এবার ফ্রান্স
লস অ্যাঞ্জেলেসে বেলজিয়ামের রূপকথা চূর্ণ করে স্পেন এখন সেমিফাইনালের রাজপথে। আগামী ১৪ জুলাই মঙ্গলবার ডালাসে সেমিফাইনালের মেগা ম্যাচে মাঠে নামবে লুইস ডে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। সেখানে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে আসা শক্তিশালী ফ্রান্সের। ইউরোপের দুই পরাশক্তির এই ধ্রুপদী লড়াই দেখতে পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
মন্তব্য করুন