
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য এবং সরবরাহ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে চীনের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চললেও, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ভোক্তা দেশ চীন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফলে দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়লেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়েনি। এর পেছনে চীনের কৌশলগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন, চলতি বছরে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন তেল আমদানি কমানো, পূর্বে মজুত করা তেল ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে দেয়নি। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে চীন প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি কমিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার চাপ হ্রাস পেয়েছে এবং সরবরাহ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে চীনের এই ভূমিকা অনেকটা ‘অদৃশ্য হাত’-এর মতো কাজ করছে, যা সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
গত কয়েক বছরে চীন তুলনামূলক কম দামে রাশিয়া ও ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে নিজেদের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত বৃদ্ধি করেছে।
বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন সংরক্ষণাগারে ১০০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এই বিশাল মজুত চীনকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মজুত তেলের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে, কারণ একসময় এই মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।
চীনের জ্বালানি খাতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে বৈদ্যুতিক ও নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহনের ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে।
বর্তমানে দেশটিতে বিক্রি হওয়া নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির প্রায় অর্ধেকই নতুন জ্বালানিচালিত বা বৈদ্যুতিক যান। এর ফলে গত বছর চীনে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমে গেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীনের তেল নির্ভরতা আরও কমতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এলে আগামী বছরে বিশ্ববাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করলে বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে তেলের বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক তেল বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে চীন। বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ হলে দেশটি সেই তেল কিনে মজুত করবে কি না, সেটিই হতে পারে ভবিষ্যৎ মূল্য নির্ধারণের অন্যতম প্রধান বিষয়।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে বৈশ্বিক রূপান্তরের এই সময়ে চীনের জ্বালানি নীতি, তেল ক্রয় কৌশল এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক তেল বাজারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: সিএনএন
মন্তব্য করুন
২৩ জুন ২০২৬, ১০:৩১ এএম
২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম